সূচনা :
মানব ইতিহাসের শুরু হতে আমাদের মানব সভ্যতা বহু যুগ অতিক্রম করে আজ তবে আধুনিক, মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত যে যুগ সেটা হলো লৌহ যুগ । আর মানব সভ্যতার ইতহাসে আলোচিত চারটি যুগের সর্বশেষ যুগ এটি । এর আগে রয়েছে ব্রোঞ্জ, তাম্র ও প্রস-র যুগ । তবে এই যুগগুলোর নামকরন করা হয়েছে মূলত যে যুগে মানুষ যেটির ব্যবহার শিখেছে সেই ব্যবহার অনুসারে । যেমন মানুষ যে যুগে লৌহের ব্যবহার শেখে সে যুগকে বলা হয়েছে লৌহ যুগ। কিন্তু মানুষ যখন পারমানবিক শক্তির ব্যবহার শিখেছিল এবং হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে বোমা নিক্ষেপ করেছিল সেই যুগকে পারমানবিক যুগ বলা হয়েছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে । তবে বলাটাই ছিল স্বাভাবিক ।
পরমানু কি :

পরমানু হলো পদার্থের দ্রুততম অবস্থা । প্রাচীন গ্রীসে আজ থেকে ২৫০০ বছর পূর্বে লুসিপাস এবং তার ছাত্র ডেমোক্রিটাস বলেন যে, সব পদার্থ অসংখ্য খুদ্র খুদ্র অবিভাজ্য কণা দ্বারা গঠিত-ডেমোক্রিটাস এ অবিভাজ্য খুদ্রতম কণার নাম দেন এ্যাটোমা ।
আর উনিশ শতাব্দির আগ পর্যন্ত- বিজ্ঞানীদের ধারনা ছিল পরমানু পদার্থের খুদ্রতম অবস্থা এবং ইহা অবিভাজ্য । কিন্তু ১৮৯৭ সালে টমসন ইলেকট্রন আবিস্কার করলে এ ধারনার পতন ঘটে।
এরপর ১৯১৯ সালে রাদারফোর্ড প্রোটন এবং ১৯৩২ সালে চ্যাডউইক ইলেকট্রন আবিস্কার করেন। আর তার ফলে পরমানু সম্পর্কে একটা সুপ্রতিষ্ঠিত ধারনা পাওয়া যায়, আর তা হলো - উপযুক্ত সংখ্যক প্রোটন ও নিউট্রন নিয়ে পরমানুর নিউকিয়াস গঠিত এবং তাকে ঘিরে ইলেকট্রন প্রদনি করে। পরমানুর ব্যাস প্রায়

এবং নিউকিয়াসের ব্যাস প্রায়

নিউকিয়ার বিক্রিয়া কি এবং কেন?
কোন উচ্চগতি সম্পন্ন কণা বা ুদ্র নিউকিয়াস দ্বারা অপর কোন পরমানুর নিউকিয়াসকে আঘাত করলে সংশ্লিষ্ট নিউকিয়াসের পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন নিউকিয়াস বিশিষ্ট পরমানুর উদ্ভব ঘটে, তাকে নিউকিয়ার বিক্রিয়া বলে ।
সর্বপ্রথম ১৯১৯ সালে রাদারফোর্ড আলফা কণা দ্বারা নাইট্রোজেন পরমানুর নিউকিয়কে আঘাত করে অঙিজেন ও প্রোটন উৎপন্ন করেন। সংঘটিত বিক্রিয়াটি হল ঃ

কিন্তু কথা হলো নিউকিয়ার বিক্রিয়া এক প্রকার নয়, বিভিন্ন প্রকারের নিউকিয়ার বিক্রিয়া আছে । তবে যত প্রকার নিউকিয়ার বিক্রিয়া থাকুক না কেন, প্রত্যেক প্রকার বিক্রিয়া ঘটানোর পেছনে একটাই মাত্র উদ্দেশ্য হল শক্তি উৎপন্ন করা ।
নিউকিয়ার বিক্রিয়াগুলো হলো :
১. ট্রান্সম্যুটেশন
২. স্ট্রিপিং ও পিক আপ বিক্রিয়া
৩. বিপেন
৪. ফিশান
৫. ফ্রাগমেন্টেশন
৬. স্যালেশন
৭. ফিউশন
তবে এর মধ্যে ফিশান এবং ফিউশন বিক্রিয়াই হলো উল্লেখযোগ্য।
নিউক্লিয়ার ফিশান :
নিউট্রন দ্বারা আঘাত করে যদি কোন ভারী পরমানুর নিউকিয়াসকে প্রায় সমভার বিশিষ্ট দুটি অংশে বিভক্ত করা যায় এবং বিপুল পরিমান শক্তির উদ্ভব হয়, তাহলে নিউকিয়াসের এ বিভাজনকে নিউকিও ফিশান বলা হয়।
১৯৩৯ সালে দুই জার্মান বিজ্ঞানী অটোহান এবং স্ট্রসম্যান ইউরেনিয়াম নিউকিয়াসের উপরে নিউট্রনের আঘাত পর্যবেন করতে গিয়ে দেখেন যে, ইউরেনিয়াম নিউকিয়াস সমান দুইটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। যার একটি বেরিয়ামের

এবং অপরটি ক্রিপটনের

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বিক্রিয়াটি নিম্নরুপ :

শক্তি অর্থাৎ নিউকিয়াসকে নিউট্রন দ্বারা আঘাত করলে খুব কম সময়ের জন্যে

নিউক্লিয়াস তৈরী হয় এবং সাথে সাথে তা ভেঙ্গে গিয়ে

এবং

উৎপন্ন হয়।
ফিশানে সৃষ্ট পদার্থগুলোর ভর ফিশানে অংশগ্রহনে পদার্থ গুলোর ভর অপো কম হয় আর এই ভর ঘাটতি আইনস্টাইনের সমীকরন

অনুযায়ী সমমানের শক্তিতে পরিনত হয়।
ফিশান বিক্রিয়ার উদাহরন হল :
১) শৃঙ্খল বিক্রিয়া ২) নিউকিয় চুল্লী।
১) শৃঙ্খল বিক্রিয়া: একটি নিউট্রন দ্বারা ইউরেনিয়াম পরমানুর ফিশান সংঘটিত হলে কয়েকটি নিউট্রনের উৎপত্তি হয়। এদের গৌন নিউট্রন বলে।
এ গৌন নিউট্রনগুলো খুবই শক্তি সম্পন্ন এবং এরা আরও অনেক ইউরেনিয়াম নিউকিয়াসের বিভাজন ঘটাতে পারে। অর্থাৎ একবার ফিশান বিক্রিয়া শুরু হলে অবিরামভাবে এ বিক্রিয়া চলতে পারে। ধরা যাক প্রতিটি ফিশান বিক্রিয়ায় দুটি করে গৌন নিউট্রন যুক্ত হয়। এই মুক্ত নিউট্রন দুটি নিউট্রনকে আঘাত করবে এবং মোট চারটি নিউট্রন উৎপন্ন হবে। এভাবে পরমানুর ফিশান সংখ্যা দ্রুত হারে বাড়তে থাকে এবং পর্যায়ক্রমে শৃঙ্খলের মত এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
২) নিউকিয়ার চুল্লী ঃ যে যান্ত্রিক ব্যবস'ার সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার দ্বারা নিউকিয় শক্তি উৎপন্ন করা হয় তাকে নিউকিয় চুল্লী বলে।
নিউকিয় ফিউশন :
একাধিক হাল্কা পরমানুর নিউকিয়াসের সংযুক্তির ফলে প্রচুর পরিমানে নিউকিয় শক্তি উৎপন্ন হয়। নিউকিয়াসের এই সংযোগকে নিউকিয় ফিউশন বলা হয়।
যেমনঃ

শক্তি
সূর্যের শক্তি:
সূর্য থেকে আমরা যে শক্তি পাই তা নিউকিয় ফিউশনের মাধ্যমে তৈরী হয়।১৯৩৯ সালে আমেরিকার বিজ্ঞানী বেথে এবং জার্মান বিজ্ঞানী ভাইসেকার একই সাথে এ সিদ্ধানে- আসেন যে, সূর্যের অভ্যন-রে অত্যন- উচ্চ তাপমাত্রায় নিউকিয় ফিউশন বিক্রিয়ার ফলেই প্রতিনিয়ত প্রচন্ড শক্তির উদ্ভব হয়।
সূর্যের অভ্যন-রে ৩৫% হাইড্রোজেন এবং এছাড়াও কার্বন নাইট্রোজেন প্রভৃতি রয়েছে। অত্যন- উত্তাপে এ সকল পদার্থ প্লাজমা অবস'ায় থাকে।
হাইড্রোজেন বোমাঃ
এছাড়াও হাইড্রোজেন বোমা তৈরী হয় নিউকিয় ফিউশন সৃষ্টিকারী ভারী পদার্থ দিয়ে। হাইড্রোজেন নিউকিয়াস সমূহের সংযোগের ফলে যে বোমা তৈরী হয় তাকে হাইড্রোজেন বোমা বলে। নিউকিয় ফিউশন সৃষ্টিকারী পদার্থ ডিউটেরিয়াম

ও ট্রিটিয়াম

হচ্ছে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ। হাইড্রোজেন বোমার অভ্যন-রে থাকে একটি পরমানু বোমা এবং ডিউটেরিয়াম ও ট্রিটিয়াম ধারনকারী পাত্র। ফিউশন বিক্রিয়ার জন্যে তাপ প্রয়োজন। বোমা বিস্ফোরনের ফলে এ তাপ পাওয়া যায়। ফিউশনের ফলে প্রচন্ড শক্তির উদ্ভব হয়। হাইড্রোজেন বোমা পরমানু বোমার চেয়ে অনেক বেশী শক্তিশালী।
পারমানবিক শক্তির ব্যবহার ঃ
প্রত্যেক জিনিসের দুটি দিক রয়েছে। একটা খারাপ দিক অন্যটা মন্দ দিক। তেমনি পারমানবিক শক্তি ব্যবহারেরও দুটি দিক রয়েছে, একটি মানব কল্যানে, অন্যটি মানব বিধ্বংসী কাজে। আসুন প্রথমে দেখি পারমানবিক শক্তি মানব কল্যানে কি কি অবদান রাখে।
মানব কল্যানে পারমানবিক শক্তি ঃ
পারমানবিক শক্তি বলতে পারমানবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পরমানুর অভ্যন-রিন শক্তি বের করে নিয়ে আসা। ২০০৫ সালে এই নিউকিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন শক্তির ২.১% ব্যবহৃত হয় পৃথিবীর শক্তি খাতে এবং ১৫% বিদ্যুৎ খাতে, আর ২০০৭ সালে আই এ ই সি এর মতে পৃথিবীর মোট ৩১ টি দেশে ৪৩৯টির মতো নিউকিয়ার প্লান্ট কাজ করছে। ইউএসএ তার ইলেকট্রিক শক্তির ১৯% নিউকিয়ার শক্তি দিয়ে মেটায়। আর সবথেকে বেশী নিউকিয়ার শক্তি ব্যয় করে ফ্রান্স। তারা তাদের চাহিদার ৭৮%ই মেটায় নিউকিয়ার শক্তি দিয়ে। ইউরোপিয় ইউনিয়ন ৩০% এর মতো চাহিদা মেটায় নিউকিয়ার শক্তি দিয়ে।
মানব অকল্যানে পারমানবিক শক্তি ঃ
পারমানবিক শক্তির অকল্যানকর দিকও অভাবনীয়। মানব কল্পনা শক্তির বাইরে এর বিধ্বংসী মতা। ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্ট হিরোসিমায় “লিটল বয়” এবং ৯ আগষ্ট নাগাসাকিতে “ফ্যাট ম্যান” কেড়ে নেয় দুই লাধিক জাপানির প্রান। এটি যে পরিমান ধ্বংস করে, তার চাইতে দীর্ঘস'ায়ী প্রভাব ফেলে বেশী। এখনও তেজস্ক্রিয় পদার্থের বিক্রিয়াজনিত পরিনতি বয়ে চলছে